ভাবসম্প্রসারণ : যে নদী হারায়ে স্রোত চলিতে না পারে, সহস্র শৈবালদাম বাঁধে আসি তারে; / যে জাতি জীবনহারা অচল অসার, পদে পদে বাঁধে তারে জীর্ণ লোকাচার।
| Article Stats | 📡 Page Views |
|---|---|
|
Reading Effort 708 words | 4 mins to read |
Total View 45.9K |
|
Last Updated 10-May-2026 | 10:31 PM |
Today View 2 |
যে নদী হারায়ে স্রোত চলিতে না পারে,
সহস্র শৈবালদাম বাঁধে আসি তারে;
অথবা,
যে জাতি জীবনহারা অচল অসার,
পদে পদে বাঁধে তারে জীর্ণ লোকাচার।
মূলভাব : নদী যেখানে তার গতিধারা হারিয়ে ফেলে সেখানে শৈবালসহ নানা ধরনের লতাগুল্মের জন্ম হয়। তদ্রুপ, কোনো জাতি যখন অনগ্রসর এবং অলস অবস্থায় পতিত হয় তখন জাতির জীবনে আসে ধ্বংসাত্মক পরিণতি।
সম্প্রসারিত ভাব : নদীর প্রকৃতি চিহ্ন হয় তার প্রবাহমানতা দ্বারা। বহতা শক্তির অভাবই নদীর মৃত্যু। যে নদী নিরন্তর প্রবাহিত হয়, উৎস থেকে সমুদ্রসংগম পর্যন্ত সদাচঞ্চল স্রোতধারার দুই পার্শ্বে নতুন নতুন সভ্যতার বিকাশ সম্ভব করে, সে-নদী কোনো বাঁধা স্বীকার করে না। তার জলকল্লোলে দুর্জয় প্রাণের ঝংকার তার তরঙ্গধারায় যুক্ত জীবনের ছন্দোময়তা, তার গতিচাঞ্চল্যে বিঘ্নজয়ী দুর্বার বলিষ্ঠতা দৃশ্য হয়ে ওঠে। তাই নদী ‘চলার বেগে পালন-পারা, পথে পথে বাহির হয়ে আপন-হারা।’ কিন্তু স্তিমিত জলস্রোত নদীর গতিকে মন্থর করে, তার অঙ্গে অঙ্গে সমাচ্ছন্ন হয় শৈবাল, তার প্রাণধর্মের অবলুপ্তি ঘটে। নদীর প্রকৃতি ও জাতির ধর্ম সাদৃশ্যের সূত্রেই বিবেচ্য।
প্রাণসমৃদ্ধ ব্যক্তির জীবন ও জাতির জীবনে প্রচ্ছন্ন থাকে গতিধর্ম। গতিচঞ্চল জীবনই জাতিকে দেয় শোধন ও সৃজনের ক্ষমতা। স্বাধীন বুদ্ধি, নিরপেক্ষ বিচারবোধ, সংস্কারমুক্ত মানসিকতা ও বলিষ্ঠ কর্ম জীবন প্রবাহকে গতিশীল করে রাখে। জাতি সঠিক পথে এগিয়ে চলে। তার স্বাভাবিক বিকাশ ও স্পন্দনের পথ ধরে নির্মিত হয় জাতির উজ্জ্বল স্বাতন্ত্র্য। চিত্তের মহৎ সম্পদে পুষ্পিত সেই বর্ণিল স্বাতন্ত্র্য ক্রমোন্নত সভ্যতার অবিচ্ছিন্ন অঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু জাতির প্রবাহমানতা কাল থেকে কালান্তরে অভিন্নতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হতে পারে। তবে ক্লান্ত মন্থরতায় তখন পুঞ্জীভূত হয় জীবন-বিরোধী সংকীর্ণ সংস্কার, নিষ্প্রয়োজন প্রথা গুচ্ছ। নির্ভয় চিত্ত ও অখণ্ড দৃষ্টিভঙ্গি, মুক্ত জ্ঞান ও হৃদয়নিষ্ঠ উচ্চারণ জীবন থেকে প্রস্থান করে। সেই সঙ্গে হারিয়ে যায় বিচিত্র প্রকৃতির বহুমুখী কর্মধারা ও প্রাত্যহিক তুচ্ছতার ঊর্ধ্বে উত্তরণের বীর্য, অবিভক্ত পৌরুষ ও সংগ্রামী শক্তি। আচারে আবৃত বিবেক স্বচ্ছ-শুভ্র মানবতার মুখর কণ্ঠকে মৌন করে দেয়। দুর্বার প্লাবনের দূরাভিসারী ক্ষমতা হারিয়ে জাতি নিষ্ক্রিয়তার দূষণকে নিশ্চিত করে। নিষ্প্রাণতায় আস্তীর্ণ অক্ষম অধীন এ রূপান্তরই জানিয়ে দেয়, জাতির মৃত্যুকাল আসন্ন। ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে, জড়তা-জর্জর সে-সব জাতির কথা, যারা পৃথিবীর নানা কালপর্বে তিমিরাচ্ছন্ন জীবন-সংকটের নজির হয়েছিল। তখন কোনও জাতীয় নায়কের আবির্ভাবে জাতি নতুন প্রাণধর্মে গতিশীল হয়েছে, নতুবা মৃত্যুর অন্ধকারে চিরকালের মত অদৃশ্য হয়ে গেছে।
স্থির জলের স্রোত যেখাবে নদীর গতিকে মন্থর করে, তেমনি কোনো জাতি চেতনা ও আদর্শ থেকে চ্যুত হলে বিভিন্ন ধরনের বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়।
এই ভাবসম্প্রসারণটি অন্য বই থেকেও সংগ্রহ করে দেয়া হলো
ভাব-সম্প্রসারণ : সৃষ্টিশীল যা কিছু দৃশ্যমান, তার সবকিছুই প্রবাহমান। চলমানতাই জীবনের বৈশিষ্ট্য, নিশ্চলতা মৃত্যু। স্থবিরতা ব্যক্তি ও সমাজজীবনকে যেমন স্তিমিত করে দেয়, জাতীয় জীবনকেও করে বিপর্যস্ত। ঐশ্বর্যমণ্ডিত ও সমৃদ্ধ জাতীয়-জীবনে তাই গতিশীলতার কোনো বিকল্প নেই।
নদীর গৌরব তার স্রোতধারার মধ্যে, স্রোতই নদীকে গতিশীলতা দান করে, তার বুকে ভরে দেয় পূর্ণতার সার্থকতা। সব ঝঞ্জাল, মালিন্য আর ক্লেদাক্ত আবর্জনা নদীর দুরন্ত গতিধারায় ভেসে চলে যায়। নদীর বহমান ধারায় প্রতি মুহূর্তে জলরাশি নিত্য-নতুন, কোনো পঙ্কিল বাধা তার জলকে মলিন করে তুলতে পারে না। সব মালিন্য ধৌত করে নদী আপন বেগে চির-চঞ্চল; উৎস থেকে মোহনার পূর্ণতার অভিমুখে নিত্য ধাবমান। এই নদীই তার গৌরব হারায় যখন কোনো কারণে তার বেগ মন্দীভূত হয়ে পড়ে, তার স্রোতধারা রুদ্ধ হয়ে যায়, তার গতি স্থির হয়ে যায়। তখন তার বুক শৈবাল বা আবর্জনায় ভরে ওঠে। তদ্রুপ, ব্যক্তিগত তথা সামাজিক জীবনে কোনো ব্যক্তি যদি স্থবির হয় তবে তার জীবনে উন্নতির আশা অবাস্তব কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। নদীর মতোই জাতির জীবনের পূর্ণতাও নির্ভর করে তার চলমানতার ওপর। অগ্রগমনই জাতির বিকাশোন্মুখের পরিচায়ক। যে জাতির স্বাভাবিক চলনধর্ম আছে, সে জাতিই নবীন সভ্যতাকে সহজে আত্মসাৎ করতে পেরেছে। সংকীর্ণ আচার-বিচার-সংস্কার সে জাতির গতিপ্রবাহকে রুদ্ধ করতে পারে না, সচলতার বেগেই সব বাধাকে অনায়াসে সে অতিক্রম করে যায়। স্বচ্ছন্দ ও নির্বাধ গতিতে এগোতে না পারলে জাতির আত্মবিকাশ ব্যাহত হয়। পদে পদে শাস্ত্রের অনুশাসন ও দেশাচারের বাধা-নিষেধ স্বতঃস্ফূর্ত বহমান জীবনধারাকে স্তব্ধ করে। চলমানতা হারিয়ে ফেলার অর্থই হল জাতির ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সফল সম্ভাবনার অপমৃত্যু। জীবনে উন্নতির চাবিকাঠি হল সংস্কারমুক্ত হয়ে গতিময়-জীবনের দিকে অগ্রসর হওয়া। যে জাতি যতদিন উন্নয়নকামী ও কর্মঠ থাকে, ততদিন কোনোরূপ কুসংস্কার তার গতি রোধ করতে পারে না। কিন্তু সে-জাতি যদি তার পুরাতন ঐতিহ্যকে বুকে ধরে অগ্রগতির পথে না এগোয় তবে স্রোতহীন নদীর মতোই শত সংস্কার এসে তাকে ঘিরে ফেলে। ফলে ধীরে ধীরে সে এ-ধারা থেকে লয়প্রাপ্ত হয়। একইভাবে ব্যক্তিজীবনেও গতিশীলতার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, সংগ্রামে-সংঘাতের মধ্য দিয়ে জীবনের শ্রেষ্ঠ ফসলটি তুলে নেওয়া যায়। কর্মবীর মানুষই সৌভাগ্যের স্বর্ণশীর্ষে হয় আসীন। বিপরীতপক্ষে যারা অলস, কর্মবিমুখ, জীবনের চলার পথ যাদের রুদ্ধ, স্থির, তাদের পদে পদে বরণ করে নিতে হয় পরাজয়, জীবনভর তাকে হতাশায়, নিরাশায় দীর্ঘশ্বাসের সেতু রচনা করতে হয়।
যে জাতির জীবনধারা অচল, অসার সে জাতির অপমৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। গতিশীল জীবনপ্রবাহেই জাতীয় জীবনকে করে জীবন্ত ও উজ্জ্বল।
Leave a Comment (Text or Voice)
Comments (2)
Good
I think it's need a English proverb