প্রবন্ধ রচনা : বাংলা সাহিত্যের পরিচয়

Article Stats 📡 Page Views
Reading Effort
919 words | 6 mins to read
Total View
2.9K
Last Updated
24-Dec-2024 | 04:13 PM
Today View
0
ভূমিকা : রূপধন্য রূপসী বাংলা আমাদের মাতৃভূমি। বাংলা ভাষা আমাদের মাতৃভাষা। এ ভাষায় গৌরবময় ঐতিহ্য হাজার বছরের প্রাচীন। এর গৌরবময় ঐতিহ্যের জন্যে আমরা গর্বিত এবং বিশ্বের বুকে আদৃত।

বাংলা ভাষার উদ্ভব। আজ থেকে এক হাজার বছর আগে জনসাধারণের কথিত ভাষা প্রাকৃত থেকে বাংলা ভাষার উদ্ভব হয়েছে। কিন্তু অনেকের ধারণা যে, বাংলা ভাষার উদ্ভব হয়েছে সংস্কৃত ভাষা থেকে। আসলে কিন্তু তা নয়। সংস্কৃতভাষী অভিজাত শ্রেণীর লোকজন নীচু শ্রেণীর লোকজনের ‘প্রাকৃত’ বলে অভিহিত করত এবং তাদের মুখের ভাষার নাম ছিল প্রাকৃত। কালক্রমে প্রাকৃত ভাষা সাধারণ লোকের মুখে বিবর্তনলাভ করে অতি-প্রাকৃত হয়ে পড়ে। এভাবে বিবর্তিত অতি-প্রাকৃত ভাষাকে বলা হতে থাকে অপভ্রংশ। অপভ্রংশ ভাষা মগধ এলাকায় বহুল প্রচলিত ছিল। অপভ্রংশ ভাষার মাঘধী রূপ থেকে বাংলা ভাষার জন্ম।

বাংলা ভাষার রচিত হাজার বছরের পুরোনো সাহিত্য পাওয়া গিয়েছে নেপাল রাজ-দরবারের পুঁথিশালায়। এত প্রাচীনকালের সাহিত্যের নিদর্শন পৃথিবীর কম ভাষাতেই আছে। প্রাপ্ত পুরানো সাহিত্য মূলত গীতিকাভিত্তিক। গীতিকাগুলো হচ্ছে বৌদ্ধ গান। বৌদ্ধ গানকে দোঁহা বা চর্যাগীতি বলা হয়। চর্যাগীতি বা চর্যাপদে রয়েছে সহজিয়া নাথপন্থী বৌদ্ধ সাধকদের সাধন-সংকেত।

বাংলা ভাষায় সাহিত্যের বিকাশ : চর্যাগীতি থেকে বাংলা ভাষায় সাহিত্য সৃষ্টি চলে এসেছে নানাধারায় বিচিত্র রূপে। তার মধ্যে প্রধান ধারাটি হচ্ছে গীতি-কবিতার। মূলত এই গীতি-কবিতার জন্যেই বাংলা সাহিত্য বিশ্বনন্দিত। বাংলা সাহিত্যের এ গৌরব একদিনে গড়ে ওঠেনি, বহু শতাব্দী ধরে অসংখ্য কবির গীতাঞ্জলি নিবেদনে বাংলা গীতি-কবিতায় এ ঐশ্বর্যশালিনী ধারাটি পুষ্ট হয়ে উঠেছে। এত কথা, এত গান, এত কান্না বাংলা কবিতার মত আর কোথায় পাব? বাংলার বাউল, ভাটিয়ালী, মুর্শিদী, মারফতী, কীর্তন, ভজন, প্রসাদী গানের মাধ্যমে মানুষ যেভাবে উজাড় করে মনের কথা বলতে পারে তেমনটি আর কোন ভাষাতেই পারে নি। বাংলা সব গানের সুরই তো প্রাণ পাগল-করা। এরা কেবলই হারিয়ে যেত চায় সীমাহীন উর্ধ্বলোকে।

আজকের বাংলাসাহিত্য শুধু গীতি-কবিতার জন্যে নয়, তার অন্যান্য বিভাগের সমৃদ্ধির জন্যেও সাহিত্যের দরবারে সম্মানের আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত। তার লোক-গাঁথা বিশ্বের সংস্কৃত-সেবীদের ভূয়সী প্রশংসা পেয়েছে। আধুনিক বাংলা গল্প ও উপন্যাস বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ রচনার সাথে প্রতিযোগিতা করে চলেছে। কবিতার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের হাত দিয়েই বাংলা কাব্য পৃথিবীকে যা দিয়েছে, পৃথিবীর লোক বহুদিন তার ঋণ শোধ করতে পারবে না।

বাংলা ভাষার বৈশিষ্ট্য : যে ভাষায় বাংলা সাহিত্য রচিত, কেবল ভাষা হিসেবে তার গৌরবও কম নয়। বাস্তবিকপক্ষে বাংলা ভাষার মত সুশৃঙ্খল ভাষা সমগ্র সভ্য জাতির ভাষা-সমূহের মধ্যে দুর্লভ। বাংলা ভাষা বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে সুপরিকল্পিত বলে ভাষা-তাত্ত্বিক পণ্ডিতগণ মনে করেন। বাংলা ভাষার মত নিয়ম-শৃঙ্খলা পৃথিবীর আর কোনো ভাষায় নেই। প্রথমত বাংলা স্বর ও ব্যঞ্জন বর্ণের উচ্চারণগুলো সুনির্দিষ্ট। কোথাও তাদের নড়চড় নেই। এর ফলে বারবার করে বাংলা শব্দের উচ্চারণ শিখতে হয় না। যে একবার অক্ষরগুলো চিনেছে, সে বানান করে প্রায় সব শব্দই শুদ্ধভাবে পড়তে পারে।

বাংলা ভাষায় মানুষের উচ্চারিত প্রায় সব ধ্বনির জন্যেই একটি করে বর্ণ আছে। সেজন্যে অন্য ভাষার শব্দ বাংলায় সহজে লেখা যায়-কষ্ট হয় না, অক্ষর ধার করতে হয় না। বাংলা লিপিতে অবশ্য একটি অসুবিধা আছে। সেটি হল যুক্তবর্ণ। এতে লিপি জটিল হয়ে যায়। ছাপতে গেলে অনেক টাইপের দরকার হয়, আর লিখতে গেলে একটা বর্ণ একটার সাথে জড়িয়ে যায়।

বাংলা সাহিত্যের যুগ-বিভাগ : বাংলা ভাষার উদ্ভবের কাল খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দী। অবশ্য তখনও বাংলা ভাষা অপভ্রংশ অবহটঠের প্রভাব সম্পূর্ণ কাটিয়ে উঠতে পারে নি। উদ্ভবের কাল থেকে বর্তমান সময়ে পৌঁছুতে হাজার বছরে বাংলা ভাষায় তিনটি সুস্পষ্ট স্তর লক্ষ্য করা যায়। আদি বাংলা, মধ্য বাংলা এবং আধুনিক বাংলা। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে আমরা তাকে আদি যুগ, মধ্য যুগ এবং আধুনিক যুগ বলে অভিহিত করতে পারি।

১। আদি যুগ : দশ থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত এই যুগ বিস্তৃত। এই যুগে বাংলা ভাষার একমাত্র নিদর্শন চর্যাপদ। ১২০২ অথবা ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে তুর্কি সেনানায়ক বখতিয়ার খিলজী অতর্কিত আক্রমণে গৌড় অধিকার করে নেন। বৃদ্ধ রাজা লক্ষণ সেন গৌড় ছেড়ে পূর্ববঙ্গে পালিয়ে যান। এখানেই বাংলা সাহিত্যের আদি পর্বের সমাপ্তি।

২। মধ্যযুগ : ত্রয়োদশ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত বাংলাদেশে মুসলিম শাসনের যুগ। এই কাল পর্ব বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মধ্যযুগ নামে পরিচিত। অবশ্য এই যুগের ত্রয়োদশ এবং চতুর্দশ শতকের কোন সাহিত্যিক নিদর্শন অদ্যাবধি পাওয়া যায় নি। তুর্কি বিজয়ের ফলে বাংলাদেশে দীর্ঘ দুই শতাব্দীব্যাপী যে সামাজিক ও রাষ্ট্রিক বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল সম্ভবত তার ফলে সে-যুগের সৃষ্টি নিদর্শন ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। সেজন্য অনেকে এই দুই বছরকে মধ্যযুগের বন্ধ্যাকাল বলে অভিহিত করেন। মধ্যযুগের সৃষ্টিশীল সময় হল পঞ্চদশ থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত। এই যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ ঘটনা হল চৈতন্যদেবের আবির্ভাব (১৪৮৬-১৫৩৩)। তিনি বাঙালি সমাজ ও সাহিত্যকে এমন গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিলেন যে, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বকে তাঁর নামেই চিহ্নিত করা হয়। মধ্যযুগের এই পর্বগুলো হল (ক) পাক্-চৈতন্য পর্ব (চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতাব্দী), (খ) চৈতন্য-পর্ব (ষোড়শ শতাব্দী) এবং (গ) চৈতন্যোত্তর পর্ব (সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতাব্দী)।

৩। আধুনিক যুগ : মধ্যযুগের ধারার শেষ কবি ভারত চন্দ্রের মৃত্যু হয় ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে। এর পূর্বেই পলাশীর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার শাসন কর্তৃত্বের অধিকার লাভ করে। বাঙালি জীবনের সঙ্গে ইউরোপীয় জীবনের প্রত্যক্ষ সংযোগ স্থাপিত হতে শুরু করে। ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে ছাপাখানায় প্রথম বাংলা হরফ মুদ্রিত হয়। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ কর্মচারীদের শিক্ষাদানের জন্যে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই প্রতিষ্ঠান থেকেই প্রথম বাংলা গদ্যপুস্তক ছাপা হয়ে প্রকাশিত হয়। রামমোহনের কলকাতা (১৮১৫) বসবাজের এবং বেদান্ত গ্রন্থ প্রকাশের কাল থেকেই বাঙালি জীবনে যথার্থ আধুনিক যুগের সূত্রপাত হয়েছিল। এতকাল বাংলা সাহিত্যের বাহন ছিল পদ্য। আধুনিক যুগে গদ্যভাষার প্রবর্তনে সাহিত্যের বিষয় ও আঙ্গিকে নবীনতা ও বিস্তৃতি ঘটল। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ থেকেই বাংলা সাহিত্যে আধুনিক যুগের শুরু। অবশ্য অনেকে মনে করেন, পলাশীর যুদ্ধের কাল থেকেই তার সূত্রপাত ঘটেছিল। আধুনিক যুগে রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাব এক যুগান্তকারী ঘটনা। তাঁর সৃষ্টিকাল থেকে বাংলা সাহিত্য প্রাদেশিকতার সংকীর্ণ সীমা অতিক্রম করে বিশ্বসাহিত্যে মর্যাদার আসন লাভ করেছে।

উপসংহার : হাজার বছরের কাল-পরিক্রমায় সুললিত বাংলা ভাষায় সৃষ্ট সাহিত্য বিশ্ব-সাহিত্যের দরবারে যোগ্য আসনলাভে সমর্থ হয়েছে। সাহিত্যের উৎকর্ষতা এবং ভাষার মান বিচারে বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্য বিশ্বে সপ্তম স্থান অধিকার করেছে। বাঙালি জাতি হিসেবে আমাদের যেটুকু গৌরব বিশ্বে প্রতিষ্ঠালাভ করেছে তা’ শুধু বাংলা সাহিত্যের উৎকর্ষতার খাতিরে। আজকের বাংলা সাহিত্য তার সফল শাখায়- নাটকে, কাব্যে, উপন্যাসে, প্রবন্ধে উজ্জ্বল গরিমার স্বাক্ষর রেখেছে। বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে কবি-নজরুল, বঙ্কিম-শরৎ, মধুসূধন-গিরিশ ও প্রথম চৌধুরী-শহীদুল্লাহর অবদান চিরনন্দিত হয়ে বিরাজমান। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বিস্ময়কর উৎকর্ষতা বিশ্বের সাহিত্য রস-রসিকদের যথার্থভাবেই বিস্ময়াপন্ন করে তুলেছে। আমরা আমাদের সাহিত্যের জন্যে গর্বিত।

💎 উপরের লিখাগুলো ওয়ার্ড ফাইলে সেভ করুন!

মাত্র 10 টাকা Send Money করে অফলাইনে পড়ার জন্য বা প্রিন্ট করার জন্য উপরের লিখাগুলো Microsoft Word ফাইলে ডাউনলোড করুন।

Download (.docx)

Sribas Ch Das

Founder & Developer

HR & Admin Professional (১২+ বছর) ও কোচিং পরিচালক (১৪+ বছর)। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সহজ Study Content নিশ্চিত করতেই এই ব্লগ।

🏷️ Tag Related

⚡ Trending Posts

Facebook Messenger WhatsApp LinkedIn Copy Link

✅ The page link copied to clipboard!

Leave a Comment (Text or Voice)




Comments (0)

Old Taka Archive (ota.bd)

✓ ১০০% আসল নোটের নিশ্চয়তা